৫০০ মানুষ, এক বিশ্বাস- গাঁজায় পৌছাবে সুমুদের ত্রাণ বহর

৫০০ মানুষ, এক বিশ্বাস- গাঁজায় পৌছাবে সুমুদের ত্রাণ বহর

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। নীলাভ সমুদ্রের বুক চিরে এগোচ্ছে কয়েক ডজন নৌযান। পতপত করে উড়ছে পতাকা, তাতে লেখা একটিই শব্দ— “সুমুদ”।
অর্থ— অটল থাকা।

একটা শব্দ, কিন্তু কোটি মানুষের ইতিহাস, আশা আর বেদনার বোঝা যেন তুলে নিয়েছে সে।
এই বহরে ছিলেন পাঁচশরও বেশি মানুষ। কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ মানবাধিকার কর্মী, কেউ সাধারণ স্বেচ্ছাসেবক। তাদের চোখে ঘুম নেই, তবুও ক্লান্তি নেই। প্রত্যেকের হৃদয়ে একটাই বিশ্বাস— গাজায় পৌঁছাতে হবে।

ঢাকার এক আলোকচিত্রী, শহিদুল আলম দাঁড়িয়ে ছিলেন নিজের জাহাজ “কনসায়েন্স”-এর ডেকে। সমুদ্রের ঢেউ যখন শীতল বাতাসের মতো বুকে লাগছিল, তার চোখে ফুটে উঠছিল ভিন্ন দৃশ্য— গাজায় অবরুদ্ধ মানুষের মুখ। শিউরে উঠছিলেন তিনি ভেবে, কীভাবে পৃথিবীর শিশুদের হাসি কেটে নেয় যুদ্ধ, কীভাবে সমুদ্রের ধারে থেকেও কারও কাছে পানি থাকে বিষের মতো অচল।

তিনি জানতেন, এই যাত্রা হয়তো কখনও গন্তব্যে পৌঁছাবে না। হয়তো আগেরবারের মতোই থামিয়ে দেয়া হবে, হয়তো কারও কারও রক্তে লাল হবে এই সাগর। তবুও তিনি এসেছেন। কারণ ইতিহাসের সামনে চুপ করে থাকা যায় না।

অন্য এক জাহাজ আলমা-তে ছিলেন গ্রেটা থুনবার্গ— জলবায়ুর লড়াইয়ের কিশোরী মুখ। পাশে মান্ডলা— নেলসন ম্যান্ডেলার নাতি। তাদের চোখেও একই দৃঢ়তা। যেন বলছিলেন— পৃথিবীর যেখানেই অবরোধ, নিপীড়ন, অন্যায়— সেখানে দাঁড়াতে হবে।

কিন্তু হঠাৎ আকাশে দেখা গেল হেলিকপ্টার, সমুদ্রের বুক চিরে ছুটে এল যুদ্ধজাহাজ। মুহূর্তেই ভরে উঠল বন্দুকের নল। আন্তর্জাতিক জলসীমার মাঝখানে গর্জে উঠল ইসরাইলি সেনারা।
“থেমে যাও!”
কিন্তু কে থামতে এসেছে এখানে?

আলমা জাহাজের ক্রুরা হাত তুলে দাঁড়ালেও তাদের চোখে ছিল না পরাজয়। এক নারী স্বেচ্ছাসেবক বুকের ওপর হাত রেখে ধীরে ধীরে বললেন—

“আমাদের লক্ষ্য সমুদ্র পেরোনো নয়, আমাদের লক্ষ্য অন্যায়ের দেয়াল ভেঙে ফেলা।”

শহিদুল আলম ক্যামেরা তুললেন। হয়তো তিনি জানেন, এ ছবিগুলো পৌঁছাবে না গাজায়; হয়তো সেগুলো প্রকাশ হবে কেবল পৃথিবীর বিবেকবান মানুষের চোখে। তবু তিনি চাপ দিলেন শাটারে। কারণ ভবিষ্যতের জন্যও তো সাক্ষী রাখতে হয়।

ধীরে ধীরে আটক হতে থাকল জাহাজ। কেউ কেউ ভয়ে কেঁপে উঠল, কেউ আবার গান গেয়ে উঠল—
“আমরা ফিরব, আবার ফিরব।”

সেই সুরে ঢেউগুলো যেন এক মুহূর্ত থেমে গেল। সমুদ্রও বুঝি জানে, লড়াইটা শুধু খাবার আর ওষুধের নয়— এটা মর্যাদার, অস্তিত্বের।

রাত নেমে এলো। কোথাও হয়তো গাজায় একটি শিশু মোমবাতির আলোয় পড়ছে। জানে না, সমুদ্রের বুক থেকে তার জন্য এত মানুষ রওনা দিয়েছে। হয়তো তার মা রান্না না থাকা চুলোর সামনে বসে আছে, জানে না, কেউ সমুদ্রপথে তার জন্য চাল আর ওষুধ বহন করছে।

কিন্তু ইতিহাস জানে।
এই সাগরের ঢেউ জানে।

আর পৃথিবীর প্রতিটি বিবেকবান হৃদয় জানে—
“সুমুদ” মানে হলো হাল না ছাড়া।
মৃত্যু নয়, জীবনকে বেছে নেওয়া।
অবরোধ নয়, মুক্তির পথে অটল থাকা।

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।