উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলা সদর কোথায় হবে: নীতিমালার আলোকে একটি দৃষ্টিভঙ্গি

উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলা সদর কোথায় হবে: নীতিমালার আলোকে একটি দৃষ্টিভঙ্গি

✍️ মোহাম্মদ হোসেন
Assistant Manager (HR), Dhaka Power Distribution Company Limited – DPDC

উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলাকে ঘিরে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির আলোচনা এখন আলোচিত বিষয়। উপজেলা সদর দপ্তর কোথায় হবে — সেটিই বর্তমানে মূল বিতর্ক। প্রস্তাবিত নাম ভূজপুর; তবে প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই নতুন উপজেলার কেন্দ্রস্থল?

আমি এই বিষয়টি দেখেছি সরকারি নীতিমালার আলোকে — “নতুন উপজেলা ও থানা স্থাপন (সংশোধিত) নীতিমালা, ২০০৪”। নীতিমালাটি পড়লে দেখা যায়, উপজেলা সদর দপ্তর নির্বাচনের সময় কয়েকটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলা সদর কোথায় হবে: নীতিমালার আলোকে একটি দৃষ্টিভঙ্গি

নীতিমালার মূল কথা: কেন্দ্রস্থল ও যোগাযোগব্যবস্থা

নীতিমালার ৩(ক) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে— “সদর দপ্তর উপজেলাটির কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করা হবে এবং আন্তঃইউনিয়ন যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকা আবশ্যক।”

এই নির্দেশনা অনুযায়ী, ভূজপুর কোনোভাবেই উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলার কেন্দ্রস্থল নয়। যদি আমরা জনসংখ্যা, দূরত্ব ও যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকে দেখি, তাহলে দাতমারা বা নারায়ণহাট—এই দুটি অঞ্চলই ভৌগোলিকভাবে অনেক বেশি কেন্দ্রীয় অবস্থানে।

ভুল ব্যাখ্যা: “থানা যেখানে, উপজেলা সেখানেই”

নীতিমালার ৩(ঘ) ধারায় বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত স্থানে থানা, স্কুল, কলেজ, ব্যাংক ইত্যাদি সুবিধা থাকলে তা “ইতিবাচক বিষয়” হিসেবে গণ্য হবে।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই “ইতিবাচক” কথাটিকে অনেকে “আবশ্যিক” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

এখন এমন একটি প্রচার চালানো হচ্ছে যে,

“থানা যেখানে, উপজেলা সদরও সেখানে হতে হবে।”

এটি পুরোপুরি ভুল ব্যাখ্যা। নীতিমালায় কোথাও এমন কথা বলা হয়নি। বরং সেখানে বলা হয়েছে, কেন্দ্রস্থল নির্বাচনই হবে প্রধান শর্ত, আর থানা থাকা কেবল একটি সহায়ক বিষয় মাত্র।

আমরা যদি নতুন থানা স্থাপনের নীতিমালার দিকে তাকাই, সেখানে ১(ছ) ধারায় বলা আছে— “থানার সদর দপ্তর অধিক্ষেত্রের যতদূর সম্ভব কেন্দ্রস্থলে হবে এবং মূল থানার সদর দপ্তর থেকে কমপক্ষে ৮–১০ কিলোমিটার দূরে হবে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভূজপুর থানা ফটিকছড়ি থানার মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, অথচ উত্তর প্রান্তের ইউনিয়ন বাগানবাজার থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩২ কিলোমিটার। অর্থাৎ, ভূজপুর থানা মূলত উত্তরাঞ্চলের কেন্দ্রস্থল নয়।

আমার ধারণা, তখনকার সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবে নেওয়া হয়েছিল, নীতিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নয়। এখন সেই একই স্থানকে “থানা আছে” যুক্তিতে উপজেলা সদর হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে—যা নীতিমালার আত্মার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

একটি উপজেলার সদর দপ্তর এমন জায়গায় হওয়া উচিত, যেখান থেকে নাগরিকরা সহজে সরকারি সেবা নিতে পারেন।

যদি সদর দপ্তর এমন এলাকায় হয়, যা ভৌগোলিকভাবে এক প্রান্তে, তাহলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘপথ অতিক্রম করে প্রশাসনিক সেবা নিতে হবে। এটি নাগরিক সুবিধা হ্রাস করে, যা উপজেলা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আমি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নই; তবে চাই, সিদ্ধান্ত হোক নীতিনিষ্ঠ, তথ্যনির্ভর ও সবার জন্য ন্যায্য। উত্তর ফটিকছড়ি উপজেলার সদর দপ্তর নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে—
১️ ভৌগোলিক কেন্দ্র নির্ধারণে সঠিক তথ্যভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহার করা,
২️ স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া, এবং
৩️ নীতিমালার ধারাগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করা।

যে স্থান সত্যিকার অর্থে কেন্দ্রস্থল, সহজ যোগাযোগযোগ্য এবং সেবাগ্রহণের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুবিধাজনক—সদর দপ্তর হওয়া উচিত সেখানে।

উত্তর ফটিকছড়ি একটি সম্ভাবনাময় প্রশাসনিক অঞ্চল হতে পারে, যদি এর ভিত্তি স্থাপন হয় ন্যায্যতা ও নীতির ওপর। ভূজপুর হোক বা অন্য কোনো স্থান—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নীতিমালাকে সামনে রেখে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

অবশেষে, “উপজেলা” যেন সত্যিকার অর্থে “উপ”-জাতীয় প্রশাসন হয়—কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রভাবাধীন কেন্দ্র নয়।

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।